ঢাকা ০৩:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মির্জাগঞ্জ উপজেলা স্টুডেন্ট’স ফোরামের নেতৃত্বে ডা. মেহেদী ও সৈকত সাতকানিয়ায় কোরবানির ঈদ এখনো জমে উঠেনি বাজার হবিগঞ্জ জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অবদান রাখায় ও বিশেষ সম্মাননা পেলেন পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য হলেন প্রযুক্তিবিদ মোঃ শাহবাজ মিঞা শোভন বাংলাদেশে ইলেক্ট্রিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি ও চার্জিং স্টেশনকে প্রাধান্য দেওয়া হয় নাই: বিইএমএ স্মার্ট ও সুখী সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়তে যুবলীগ নিরলস কাজ করছে-হেলাল আকবর নজরুল রাজের প্রযোজনায় একক নাটক ‘রাইটার’ গোসাইরহাটে জেলেদের মাঝে বিনামূল্যে বকনা বাছুর বিতরণ অগ্রণী ব্যাংক নলছিটি শাখা’র আর্থিক স্বাক্ষরতা কর্মসূচী দিবস পালিত

প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় হারাচ্ছে তাঁজা প্রাণ!

  • মাসুদ রানা
  • আপডেট সময় : ১১:৫৪:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জুন ২০২৩
  • ২২০১ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের এমন কোনো দিন নেই যে সড়কপথে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে স্বজনদের অশ্রুপাত ঘটেনি এমন দিনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনা অতি তুচ্ছ বিষয়ে পরিণত হওয়ায় এটিকে সামাল দেওয়ার মতো কোনো কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। খাতাপত্রে এসব দেখভালের দায়িত্ব যাদের তারা কর্তব্য পালনের বদলে নিজেদের পকেট স্ফীত করার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন- এমন অভিযোগ প্রবল।

গত ৭ জুন বুধবার শুধু সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। পেশায় তারা সবাই নির্মাণশ্রমিক। কাজের জন্য পিকআপ ভ্যানে করে হতভাগ্য শ্রমিকরা যাচ্ছিলেন কর্মস্থলে। পথিমধ্যেই বেপরোয়া ট্রাক কেড়ে নিয়েছে ১৪টি তাজা প্রাণ। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। বুধবার সকাল ৬টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার নাজিরবাজার কুতুবপুরে পিকআপ ভ্যান ও আলুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে গভীর শোকের ছায়া গ্রাস করেছে ১৪টি পরিবারকে। ভোরে সিলেট নগর থেকে ৩০ জন নির্মাণশ্রমিক ওসমানীনগর উপজেলার গোয়ালাবাজারে যাচ্ছিলেন। শ্রমিকবাহী পিকআপ ভ্যানটি নাজিরবাজারের কুতুবপুর যাওয়ার পর বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে পতিত হয়। এতে পিকআপ ভ্যানটি উল্টে যায়। এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান ১১ শ্রমিক। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাকিদের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও তিনজন মারা যান। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের ধারণা, ট্রাকচালক সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যা দুর্ঘটনা অনিবার্য করে তোলে।

২০২২ সালে গত ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। ৬৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৯৫১ জন নিহত, ১২৩৫৬ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনার সংবাদের উপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, বিদায়ী ২০২২ সালে ৬৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৯৫১ জন নিহত, আহত হয়েছেন ১২৩৫৬ জন। ২০২১ সালের চেয়ে ২০২২ সালে সড়কে দুর্ঘটনা ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও প্রাণহানি ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে।
নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও ত্রি-হুইলার সরকারি আদেশ অমান্য করে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে অবাধে চলাচলের কারনে বিগত ৮ বছরের মধ্যে বিদায়ী ২০২২ সালে সড়কে সর্বোচ্চ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে পেশাগতভাবে ভাগ করে বলা হয়, সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ৩০৯০ জন চালক, ১৫০৩ জন পথচারী, ৭৪২ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮৮৫ জন শিক্ষার্থী, ১৩২ জন শিক্ষক, ২৮৩ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১১৫০ জন নারী, ৭৯৪ জন শিশু, ৪৪ জন সাংবাদিক, ৩১ জন চিকিৎসক, ১৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৫ জন শিল্পী, ৯ জন আইনজীবী ও ২৯ জন প্রকৌশলী এবং ১৬৮ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।
নিহত ১১৪ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ২৭ জন সেনা সদস্য, ৬২ জন পুলিশ সদস্য, ২ জন র‌্যাব সদস্য, ৯ জন বিজিবি সদস্য, ৫ জন নৌ-বাহিনীর সদস্য, ৮ জন আনসার সদস্য, ২ জন ডিজিএফআই সদস্য, ১ জন বিমান বাহিনীর সদস্য, ১ জন সিআইডি, ১ জন এনএসআই সদস্য, ১৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ২৪ জন সাংবাদিক, ৭০৩ জন নারী, ৫৮৮ জন শিশু, ৬৬৬ জন শিক্ষার্থী, ১১৭ জন শিক্ষক, ২৩৮৩ জন চালক, ৪২১ জন পরিবহন শ্রমিক, ২৭ জন প্রকৌশলী, ৯ জন আইনজীবী, ১৩৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ৩১ জন চিকিৎসক।
মোট দুর্ঘটনার ৫২ দশমিক ৫৫ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২১ দশমিক ৬১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ বিবিধ কারণে, শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ সালের তুলনায় বিদায়ী ২০২২ সালে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ গাড়িচাপা, শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে, শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা কমেছে। ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ বেড়েছে।
দুর্ঘটনার এলাকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৫২ দশমিক ০২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১ দশমিক ৭১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ লেভেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে সড়ক দুর্ঘটনা কমলেও মে মাসে বেড়েছে ৪৯ শতাংশ। এ মাসে ৫ হাজার ৫০০ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৫৩৬ জন। ২০২৩ সালের ১ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত এক হাজার ৬২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন এক হাজার ১৮৭ জন, নিহত ৫০ জন। এক হাজার ৪৯৬টি ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত এক হাজার ৭৫২ এবং নিহত হয়েছেন ৬২ জন। এক হাজার ৬০৫টি বাস দুর্ঘটনায় আহত এক হাজার ৮৫৩ এবং নিহত হয়েছেন ২৬৩ জন। নাসিমন-করিমনসহ অন্যান্য তিন চাকার বাহনে এক হাজার ৩৩৭টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন এক হাজার ৭৪৪ এবং নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন।
প্রশ্ন হলো-প্রতিদিন যদি আমাদের এমন দুঃসংবাদের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে এত আন্দোলন, এত সুপারিশ-পরামর্শ ও নতুন প্রবর্তিত আইন কী কাজে লাগছে? বস্তুত জনবহুল এই দেশে যান চলাচলে শৃঙ্খলার অভাব এবং সড়ক ও পরিবহণব্যবস্থা যথেষ্ট উপযুক্ত না হওয়ার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। মূলত অশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ৮৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালক কর্তৃক বেপরোয়া গতিতে যান চালানো।
সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাসে ইতঃপূর্বে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স পেতে ও নবায়নের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা ছাড়াও তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পুলিশ কর্তৃক চার্জশিট দাখিল এবং দ্রুত ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির পথ সুগম করা হলে তা দুর্ঘটনা হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেভাবেই হোক, সড়ক-মহসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। সচেতন হতে হবে পথচারীদেরও। একই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং সড়কে চলাচল উপযোগী ভালো মানের যানবাহন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের পাশাপাশি পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা।
আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটে চালকদের গাফিলতিতে। রাতের বাস ও ট্রাকচালকদের একাংশের মধ্যে ঘুমের ঘোরে গাড়ি চালানোর প্রবণতা রয়েছে। এ নিয়ে অনেকে গর্বও করেন। এ নৈরাজ্যের অবসান হওয়া উচিত।
লেখক: কলামিস্ট ও জাতীয় পার্টি নেতা, সভাপতি, চবি অ্যালামনাই বসুন্ধরা। সংসদ সদস্য প্রার্থী ঢাকা-১৮ আসন।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

মির্জাগঞ্জ উপজেলা স্টুডেন্ট’স ফোরামের নেতৃত্বে ডা. মেহেদী ও সৈকত

প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় হারাচ্ছে তাঁজা প্রাণ!

আপডেট সময় : ১১:৫৪:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জুন ২০২৩

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের এমন কোনো দিন নেই যে সড়কপথে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে স্বজনদের অশ্রুপাত ঘটেনি এমন দিনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনা অতি তুচ্ছ বিষয়ে পরিণত হওয়ায় এটিকে সামাল দেওয়ার মতো কোনো কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। খাতাপত্রে এসব দেখভালের দায়িত্ব যাদের তারা কর্তব্য পালনের বদলে নিজেদের পকেট স্ফীত করার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন- এমন অভিযোগ প্রবল।

গত ৭ জুন বুধবার শুধু সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। পেশায় তারা সবাই নির্মাণশ্রমিক। কাজের জন্য পিকআপ ভ্যানে করে হতভাগ্য শ্রমিকরা যাচ্ছিলেন কর্মস্থলে। পথিমধ্যেই বেপরোয়া ট্রাক কেড়ে নিয়েছে ১৪টি তাজা প্রাণ। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। বুধবার সকাল ৬টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার নাজিরবাজার কুতুবপুরে পিকআপ ভ্যান ও আলুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে গভীর শোকের ছায়া গ্রাস করেছে ১৪টি পরিবারকে। ভোরে সিলেট নগর থেকে ৩০ জন নির্মাণশ্রমিক ওসমানীনগর উপজেলার গোয়ালাবাজারে যাচ্ছিলেন। শ্রমিকবাহী পিকআপ ভ্যানটি নাজিরবাজারের কুতুবপুর যাওয়ার পর বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে পতিত হয়। এতে পিকআপ ভ্যানটি উল্টে যায়। এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান ১১ শ্রমিক। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাকিদের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও তিনজন মারা যান। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের ধারণা, ট্রাকচালক সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যা দুর্ঘটনা অনিবার্য করে তোলে।

২০২২ সালে গত ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। ৬৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৯৫১ জন নিহত, ১২৩৫৬ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনার সংবাদের উপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, বিদায়ী ২০২২ সালে ৬৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৯৫১ জন নিহত, আহত হয়েছেন ১২৩৫৬ জন। ২০২১ সালের চেয়ে ২০২২ সালে সড়কে দুর্ঘটনা ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও প্রাণহানি ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে।
নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও ত্রি-হুইলার সরকারি আদেশ অমান্য করে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে অবাধে চলাচলের কারনে বিগত ৮ বছরের মধ্যে বিদায়ী ২০২২ সালে সড়কে সর্বোচ্চ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে পেশাগতভাবে ভাগ করে বলা হয়, সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ৩০৯০ জন চালক, ১৫০৩ জন পথচারী, ৭৪২ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮৮৫ জন শিক্ষার্থী, ১৩২ জন শিক্ষক, ২৮৩ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১১৫০ জন নারী, ৭৯৪ জন শিশু, ৪৪ জন সাংবাদিক, ৩১ জন চিকিৎসক, ১৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৫ জন শিল্পী, ৯ জন আইনজীবী ও ২৯ জন প্রকৌশলী এবং ১৬৮ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।
নিহত ১১৪ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ২৭ জন সেনা সদস্য, ৬২ জন পুলিশ সদস্য, ২ জন র‌্যাব সদস্য, ৯ জন বিজিবি সদস্য, ৫ জন নৌ-বাহিনীর সদস্য, ৮ জন আনসার সদস্য, ২ জন ডিজিএফআই সদস্য, ১ জন বিমান বাহিনীর সদস্য, ১ জন সিআইডি, ১ জন এনএসআই সদস্য, ১৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ২৪ জন সাংবাদিক, ৭০৩ জন নারী, ৫৮৮ জন শিশু, ৬৬৬ জন শিক্ষার্থী, ১১৭ জন শিক্ষক, ২৩৮৩ জন চালক, ৪২১ জন পরিবহন শ্রমিক, ২৭ জন প্রকৌশলী, ৯ জন আইনজীবী, ১৩৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ৩১ জন চিকিৎসক।
মোট দুর্ঘটনার ৫২ দশমিক ৫৫ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২১ দশমিক ৬১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ বিবিধ কারণে, শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ সালের তুলনায় বিদায়ী ২০২২ সালে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ গাড়িচাপা, শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে, শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা কমেছে। ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ বেড়েছে।
দুর্ঘটনার এলাকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৫২ দশমিক ০২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১ দশমিক ৭১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ লেভেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে সড়ক দুর্ঘটনা কমলেও মে মাসে বেড়েছে ৪৯ শতাংশ। এ মাসে ৫ হাজার ৫০০ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৫৩৬ জন। ২০২৩ সালের ১ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত এক হাজার ৬২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন এক হাজার ১৮৭ জন, নিহত ৫০ জন। এক হাজার ৪৯৬টি ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত এক হাজার ৭৫২ এবং নিহত হয়েছেন ৬২ জন। এক হাজার ৬০৫টি বাস দুর্ঘটনায় আহত এক হাজার ৮৫৩ এবং নিহত হয়েছেন ২৬৩ জন। নাসিমন-করিমনসহ অন্যান্য তিন চাকার বাহনে এক হাজার ৩৩৭টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন এক হাজার ৭৪৪ এবং নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন।
প্রশ্ন হলো-প্রতিদিন যদি আমাদের এমন দুঃসংবাদের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে এত আন্দোলন, এত সুপারিশ-পরামর্শ ও নতুন প্রবর্তিত আইন কী কাজে লাগছে? বস্তুত জনবহুল এই দেশে যান চলাচলে শৃঙ্খলার অভাব এবং সড়ক ও পরিবহণব্যবস্থা যথেষ্ট উপযুক্ত না হওয়ার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। মূলত অশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ৮৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালক কর্তৃক বেপরোয়া গতিতে যান চালানো।
সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাসে ইতঃপূর্বে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স পেতে ও নবায়নের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা ছাড়াও তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পুলিশ কর্তৃক চার্জশিট দাখিল এবং দ্রুত ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির পথ সুগম করা হলে তা দুর্ঘটনা হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেভাবেই হোক, সড়ক-মহসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। সচেতন হতে হবে পথচারীদেরও। একই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং সড়কে চলাচল উপযোগী ভালো মানের যানবাহন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের পাশাপাশি পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা।
আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটে চালকদের গাফিলতিতে। রাতের বাস ও ট্রাকচালকদের একাংশের মধ্যে ঘুমের ঘোরে গাড়ি চালানোর প্রবণতা রয়েছে। এ নিয়ে অনেকে গর্বও করেন। এ নৈরাজ্যের অবসান হওয়া উচিত।
লেখক: কলামিস্ট ও জাতীয় পার্টি নেতা, সভাপতি, চবি অ্যালামনাই বসুন্ধরা। সংসদ সদস্য প্রার্থী ঢাকা-১৮ আসন।